সাধারণত মানুষ যে ভুলটা বেশি করে, সেটা হলো সাধারণ আইন (General law) এবং বিশেষ বা সুনির্দিষ্ট আইন (Special or Specific law) এর মধ্যকার পার্থক্য না বুঝা। আর সে কারণে অনেকেই প্রশ্ন করে যে কুরআনে যেহেতু মৃত জীব খাওয়া হারাম বলা হয়েছে (সূরা বাকার ১৭৩), সেহেতু মৃত মাছ খাওয়া কি হারাম নয়?
➡️সংক্ষেপে উত্তর হচ্ছে:- না, হারাম নয় অর্থাৎ মৃত মাছ খাওয়া যাবে।
এবার আসুন কুরআন থেকে জেনে নেই কিভাবে মৃত মাছ খাওয়া যাবে বা জায়েজ। … এর উত্তর খোঁজার জন্যে কুরআনের কতিপয় আয়তগুলো একটু বিশ্লেষণ করেলে দেখতে পাবেন যে আল্লাহ তার কিতাবে স্পষ্ট করেই উত্তর দিয়েছেন।
(General Law) সূরা বাকারার ১৭৩ নং আয়াত এবং সূরা মায়েদাহ এর ৩ নং আয়াতে আল্লাহ বলেছেন “মৃত জীব” খাওয়া হারাম। — কিন্তু এখানে বলা হয়নি মৃত জীব কি স্থলের নাকি জলের! সুতরাং এই আইনটি স্থল এবং জল দুইয়ের জন্যেই প্রযোজ্য হবে General Law হিসেবে ততক্ষণ যতক্ষণনা আল্লাহ স্পষ্ট করে অন্য আয়াতে কিছু বলে থাকেন অর্থাৎ Special Law.
(General Law & Special Law এর পার্থক্য) সূরা মায়েদাহ এর ৫:৯৬ নং আয়াতে আল্লাহ বলেনঃ-
أُحِلَّ لَكُمْ صَيْدُ ٱلْبَحْرِ وَطَعَامُهُۥ مَتَٰعًا لَّكُمْ وَلِلسَّيَّارَةِۖ وَحُرِّمَ عَلَيْكُمْ صَيْدُ ٱلْبَرِّ مَا دُمْتُمْ حُرُمًاۗ وَٱتَّقُوا۟ ٱللَّهَ ٱلَّذِىٓ إِلَيْهِ تُحْشَرُونَ
তোমাদের জন্য হালাল করা হয়েছে সমুদ্রের শিকার ও তার খাদ্য; তোমাদের ও মুসাফিরদের ভোগের জন্য। আর স্থলের শিকার তোমাদের উপর হারাম করা হয়েছে যতক্ষণ তোমরা ইহরাম অবস্থায় থাক। আর তোমরা আল্লাহর তাকওয়া অবলম্বন কর, যার দিকে তোমাদেরকে একত্র করা হবে।
অর্থাৎ স্থলের শিকার বৈধ থাকলেও ইহরাম অবস্থায় কখনোই সেটা বৈধ নয়, অথচ সূরা বাকারার ১৭৩ এবং সূরা মায়েদাহ এর ৩ নং আয়াতে (General Law) বলা হয়েছে স্থলের শিকার আল্লাহর নামে জবেহ দিলে সেটা হালাল। অন্যদিকে, ৫:৯৬ আয়াতে ইহরাম অবস্থায় মাছ শিকারকে হারাম করা হয়নি। — তাহলে এখানে থেকে এটা স্পষ্ট বুঝা যায় যে স্থলের জীব আর জলের জীব সমান নয়। অর্থাৎ জল থেকে যে কোন সময় শিকার করা হালাল, কিন্তু ইহরাম অবস্থায় স্থল থেকে শিকার করা হারাম।
এবার দেখুনঃ–(Special Law) আল্লাহ সূরা আন-নাহল এর ১৪ নং আয়াতে বলেছেন:-
وَهُوَ الَّذِيْ سَخَّرَ الْبَحْرَ لِتَاْكُلُوْا مِنْهُ لَحْمًا طَرِيًّا وَّتَسْتَخْرِجُوْا مِنْهُ حِلْيَةً تَلْبَسُوْنَهَا ۚ وَتَرَي الْفُلْكَ مَوَاخِرَ فِيْهِ وَلِتَبْتَغُوْا مِنْ فَضْلِهٖ وَلَعَلَّكُمْ تَشْكُرُوْنَ
আর তিনিই সে সত্তা, যিনি সমুদ্রকে নিয়োজিত করেছেন, যাতে তোমরা তা থেকে তাজা গোশ্ত খেতে পার এবং তা থেকে বের করতে পার অলংকারাদি, যা তোমরা পরিধান কর। আর তুমি তাতে নৌযান দেখবে তা পানি চিরে চলছে এবং যাতে তোমরা তার অনুগ্রহ অন্বেষণ করতে পার এবং যাতে তোমরা শুকরিয়া আদায় কর।
“আর তিনিই সে সত্তা, যিনি সমুদ্রকে (ٱلْبَحْرَ) নিয়োজিত করেছেন, যাতে তোমরা তা থেকে (مِنْهُ) তাজা (طَرِيًّا) গোশ্ত (لَحْمًا) খেতে পার…”
অর্থাৎ সমুদ্র থেকে তাজা মাছের কথা বলা হয়নি, বরং বলা হয়েছে তাজা গোশ্ত (لَحْمًا طَرِيًّا) খাওয়ার কথা! অর্থাৎ জেলেদের জালে আটকে থাকা কোন মাছ যদি মৃতও হয় কিন্তু পঁচে না যায় বরং তার গোস্ত তাজা ও সজীব থাকে তাহলেও সেটা খাওয়া হালাল। অর্থাৎ গোস্ত তাজা বা সজীব হওয়া বাধ্যতামূলক, কিন্তু মাছ জীবিত হওয়া বাধ্যতামূলক নয়।
[আর তাজা গোস্ত বলতে নিশ্চই জীবিত মাছের মত গোস্ত সাঁতার কাটবে — এইটা ভাবার কোন অবকাশ নেই 😀]
তাছাড়া (Special Law) আল্লাহ সূরা ফাতির এর ১২ নং আয়াতে বলেনঃ-
وَمَا يَسْتَوِى ٱلْبَحْرَانِ هَٰذَا عَذْبٌ فُرَاتٌ سَآئِغٌ شَرَابُهُۥ وَهَٰذَا مِلْحٌ أُجَاجٌۖ وَمِن كُلٍّ تَأْكُلُونَ لَحْمًا طَرِيًّا وَتَسْتَخْرِجُونَ حِلْيَةً تَلْبَسُونَهَاۖ وَتَرَى ٱلْفُلْكَ فِيهِ مَوَاخِرَ لِتَبْتَغُوا۟ مِن فَضْلِهِۦ وَلَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ
আর দু’টি সমুদ্র সমান নয়; একটি খুবই সুমিষ্ট ও সুপেয়, আরেকটি অত্যন্ত লবণাক্ত আর প্রত্যেকটি থেকে তোমরা তাজা গোশত খাও এবং আহরণ কর অলঙ্কার (মুক্ত/প্রবাল) যা তোমরা পরিধান কর। আর তুমি তাতে দেখ নৌযান পানি চিরে চলাচল করে। যাতে তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ তালাশ কর এবং যাতে তোমরা শোকর কর।
অর্থাৎ আল্লাহ লবণাক্ত ও মিঠা উভয় পানির “তাজা গোশত” খাওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন, জীবিত মাছ নয়।
➡️ এবার চাইলে মাছের তাজা গোস্ত রোদে শুকিয়ে শুঁটকি বানিয়েও খেতে পারেন।😀
